January 15, 2026, 9:03 pm

৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাই না

Reporter Name
  • Update Time : Sunday, January 11, 2026
  • 7 Time View

হিংসা-প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার পরিণতি কী হতে পারে, তা ৫ আগস্ট দেখেছি। আমি সে জন্যই সবাইকে অনুরোধ করব, আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে; কিন্তু দল-মত নির্বিশেষে আমরা যদি চেষ্টা করি, তাহলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান বের করে আনতে সক্ষম হব। আমরা আর ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাই না।

শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ কথা বলেন। আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন বলেও জানান তিনি।

বেলা ১১টায় সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিয়মের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা তাদের বক্তব্যে স্বাধীন সাংবাদিকতার আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন। তারেক রহমানও তাঁর পক্ষ থেকে তাদের আশ্বস্ত করেন। মঞ্চে তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক
তারেক রহমান বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে মনে হয়, সামনে আমাদের অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ আছে। যে কোনো মূল্যেই হোক, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটা চালু রাখতে হবে। আমাদের জবাবদিহি চালু রাখতে হবে। সেটি জাতীয় পর্যায়ে হোক, স্থানীয় সরকার হোক, কোনো ট্রেড বডির নির্বাচন হোক। আমরা যে কোনো মূল্যে যদি এই জবাবদিহিটা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রাখতে পারি, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হব।

মতপার্থক্য যেন মতভেদে না যায়
তারেক রহমান বলেন, হিংসা, প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা, একটি মানুষ, একটি দল বা যেভাবে আমরা বিবেচনা করি– তার পরিণতি কী হতে পারে, আমরা দেখেছি ৫ আগস্ট। সে জন্য আমি সবাইকে অনুরোধ করব, দল-মত নির্বিশেষে আমরা যদি চেষ্টা করি, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারব। কিন্তু কোনোভাবেই সেটি যাতে মতবিভেদের পর্যায়ে চলে না যায়।

তিনি বলেন, মতবিভেদ হলে, বিভেদ হলে জাতিকে বিভক্ত করে ফেললে কী হতে পারে, তা আমরা দেখেছি। আজকে সে জন্যই অনেকের মুখে অনেক কথা শুনি, হতাশার কথা শুনি। আশার কথা হচ্ছে, আমাদের ভবিষ্যতের চিন্তা আছে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও আছে।

নতুন প্রজন্ম দিকনির্দেশনা চায়
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, দেশে ফেরার পরে আমি অনেক জায়গায় গিয়েছি। সব জায়গায় মনে হয়েছে, নতুন প্রজন্ম একটা দিকনির্দেশনা চাইছে। তারা আশা দেখতে চাইছে। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়; আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রতিটি প্রজন্মই মনে হয় গাইডেন্স চাইছে। আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের কাছে হয়তো তাদের অনেক প্রত্যাশা; সকল প্রত্যাশা হয়তোবা পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা রাজনীতিবিদরা যদি ১৯৭১ সাল, ১৯৯০ সাল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই সবগুলোকে আমাদের সামনে রেখে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কাজ করি, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবো।

নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নামবেন ২২ জানুয়ারি
তারেক রহমান বলেন, সামনে নির্বাচন। আমি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। স্বাভাবিকভাবেই আমরা ২২ জানুয়ারি থেকে আমাদের সব রকম পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের সামনে যাব।

আলোচনা-সমালোচনা দুইটাই চাই
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে আপনাদের কাছ থেকে এমন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা চাই, যেটা দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের সাহায্য করবে। শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা নয়, এমন সমালোচনা চাই, যা দেশের মানুষের সমস্যা সমাধানে সহায়ক হয়।

আসুন, দেশের মানুষের জন্য কাজ করি
তারেক রহমান বলেন, কাউকে আঘাত না করে আমি আমার চিন্তাটা তুলে ধরতে চাই। আসুন, আমরা দেশের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী অধিকার, কর্মসংস্থান, পরিবেশ– সাধারণ মানুষের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে কাজ করব।

তিনি বলেন, আমরা শুধু রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে সেমিনার করছি, সিম্পোজিয়াম করছি, আলোচনা করছি, তর্কবিতর্ক করছি। অবশ্যই এগুলোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা যদি মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থা কী হবে, তার কর্মসংস্থান কী হবে, তার পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার কী ব্যবস্থা হবে, রাস্তায় বের হলে নিরাপদে সে ফিরে আসতে পারবে কিনা– এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের আলোচনা আরেকটু বেশি হওয়া উচিত। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা আরেকটু বেশি হওয়া উচিত।

দেশে কী হয়েছে, আমি জানি
তারেক রহমান বলেন, আমি দেশে অনেক দিন থাকতে পারিনি। তবে সারাক্ষণই দেশের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের রক্তমাখা ছবি এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। আমি জানি, রুহুল আমিন গাজীর (ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রয়াত সভাপতি) সঙ্গে কী হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, আমার ৬০ লাখ নেতাকর্মী এবং তার থেকে আমার জন্য আরও হৃদয়বিদারক হচ্ছে, আমার মায়ের সঙ্গে কী হয়েছে। এই ঘটনাগুলো যদি আমরা এক করি তাহলে যারা দেশে ছিলেন, তারা অবশ্যই আমার থেকে একটু বেশি জানবেন। তবে আমি একদম যে জানি না, বোধ হয় বিষয়টি তা নয়, আমার একটি ধারণা আছে।

এ সময় ঢাকার পানি সমস্যা, কর্মসংস্থান, নারী শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ড চালুর কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। এ ছাড়া দুর্নীতি কমানো, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, সবার জন্য চিকিৎসা সুবিধা, তরুণ সমাজের কর্মসংস্থানের জন্য ভোকেশনাল টেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউশন আধুনিকায়ন এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, আইটি খাত, উদ্যোক্তা তৈরি করা, আইটি পার্কগুলোকে নতুনভাবে গড়ে তোলা, কনটেন্ট তৈরির কাজে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করে আরও সহজ করার মতো বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন বিএনপির চেয়ারম্যান।

অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল এবং বিএনপির চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহাদী আমীন, চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার এবং চেয়ারম্যানের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) একেএম শামসুল ইসলাম প্রমুখ।

সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকরা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান বিএনপিকে খালেদা জিয়ার বন্দিজীবনের বিষয়ে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি করার পরামর্শ দেন।

দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, আমরা গণতন্ত্র চাই, স্বাধীন সাংবাদিকতা চাই এবং সুশাসন চাই। এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও নিশ্চয় অনেকে বলেছেন। কিন্তু একটি দুটি বিষয়ে মনে হয়, যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না। সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো কী। আমি মনে করি, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ুর পরিবর্তন। এই বিষয়ে নজর দেওয়া দরকার।

মাহফুজ আনাম বলেন, আরেকটা হচ্ছে আমাদের পানি সম্পদ। আমরা কীভাবে নদী দূষণ করে যাচ্ছি! আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এ নিয়ে কাজ করতে হবে।

দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, আজকের বাংলাদেশ যেভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যাচ্ছে, যে উগ্রবাদ আমাদের গ্রাস করার চেষ্টা করছে, সেই উগ্রবাদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে তারেক রহমান ছাড়া এই মুহূর্তে কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, আমরা লিখতে চাই। আমরা বলতে চাই। ৫ আগস্টের পর মিডিয়া অনেকটা স্বাধীন, আবার অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত।

কেন নিয়ন্ত্রিত– তার ব্যাখ্যা দিয়ে এ সম্পাদক বলেন, মব ভায়োলেন্সের কারণে আমরা অনেকেই সাহসী হতে পারছি না। আমাদের হাত-পা বাঁধা পড়ে যাচ্ছে। সংবাদপত্র অফিসে যখন আগুন দেওয়া হয় তখন কষ্ট লাগে– আমরা জাহান্নামে আছি, না বেহেশতে আছি!

নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, আমরা যদি ভবিষ্যতে সমাজ এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর দেখতে চাই তাহলে অবশ্যই গণতান্ত্রিক রাজনীতির পাশাপাশি একটা গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার পরিবেশ থাকতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল যদি বিশ্বাস করে– মানুষ গণতান্ত্রিক রূপান্তর চায়, তাহলে একই সঙ্গে সেই গণতান্ত্রিক রূপান্তরে সহযোগিতা করার জন্য গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে ১৬-১৭ বছরে গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ ভয়, চাপ ও সুবিধাবাদের কারণে নিপীড়নের শিকার সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ায়নি বলে মন্তব্য করেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দেশে এসে তাঁর দলের লোক কিংবা ভারত যা বলেছে তাই বিশ্বাস করেছেন। তারেক রহমানও ১৭ বছর পর দেশে এসেছেন। তিনিও যদি তাঁর লোকদের কথা বিশ্বাস করে ওই সময়ের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নেন, তাহলে একই রকম ভুল হবে।

দৈনিক ইনকিলাবের সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন বলেন, ৫ আগস্ট-পূর্ববর্তী সময় এবং ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ের সাংবাদিকতার ধরন ভালোভাবে খেয়াল করতে হবে। গত ১৭ বছর সাংবাদিকতা করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। বিদেশে চলে গিয়ে সাংবাদিকতা করা আর বন্দুকের নলের মুখে সাংবাদিকতা করা এক নয়।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক সংবাদের সম্পাদক আলতামাশ কবির, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ, সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, বণিক বার্তার সম্পাদক হানিফ মাহমুদ, কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক আবু তাহের, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সম্পাদক ইনাম আহমেদ, প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর মারুফ কামাল খান সোহেল, দেশ রূপান্তরের কামাল উদ্দিন সবুজ, নয়া দিগন্তের সালাহ উদ্দিন বাবর, ডেইলি সানের মো. রেজাউল করিম লোটাস, কালবেলার সন্তোষ শর্মা, আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান, খবরের কাগজের মোস্তফা কামালসহ বিটিভি, বেতার, বিএসএস, বিদেশি সংবাদমাধ্যম এবং দেশের বিভিন্ন টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কর্মকর্তারা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © ajkerdorpon.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com