ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্ব সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। এই সংকট এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, যা দেশগুলোর সরকার, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় যুদ্ধ অবসানের বিষয়টি নেতাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতাই পারেন যুদ্ধ বন্ধ করে পৃথিবীতে শান্তি ফেরাতে।
ইরানের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকায় ইতোমধ্যে ট্রাম্প যুদ্ধের একটা সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন। তিন থেকে চার সপ্তাহ যুদ্ধ হতে পারে– এমন আভাস দিয়েছিলেন তিনি। পরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার পর ট্রাম্প আরও একধাপ পিছু হটে বলেছেন, যুদ্ধ সংক্ষিপ্ত সময়ে শেষ করা হবে। কিন্তু পরিস্থিতি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে, তা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে রাজনৈতিক ফলাফল দেখতে চায়, তা পেতে মূলত সময়ের দরকার। কারণ একটা দেশের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা সহজ ব্যাপার নয়। সময়ের ব্যবধানে হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হলেও ক্ষণে ক্ষণে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। ইরান সরকারের পতন না ঘটায় হরমুজের পরিস্থিতি সর্বদা উত্তাল থাকতে পারে। এভাবেই বিশ্ব এক নতুন স্বাভাবিকতার পথে হাটছে, যেখানে সংকট কখনও পুরোপুরিভাবে নির্মূল হবে না। তবে যুদ্ধ অবসানে কয়েকটি উপায়ের কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ
ট্রাম্প সেনাবাহিনীকে তাদের নির্ধারিত মিশন সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিয়েছেন, যার লক্ষ্য হলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ও অংশীদাররা মিলে ইরানকে অর্থনৈতিক ধাক্কা দিতে চায়। কিন্তু দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো অক্ষত থাকায় সরকার পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তি ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও সরকার পরিবর্তন হবে না। সে ক্ষেত্রে পারমাণবিক কর্মসূচি কিংবা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ছাড়বে না ইরান। এতে দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েই যাবে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের আকাশে তাদের নজরদারি চালিয়ে যেতে পারে। তেহরান ফের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও পারমাণবিক কর্মসূচি চালু করার চেষ্টা করতে পারে। তাতে বাধা দিতে হামলার বিকল্প পদ্ধতিতে ব্যবহার করলে যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে।
বিজয় ঘোষণা করে রণেভঙ্গ দেওয়া
যুদ্ধের পরিণতিতে অর্থনীতিতে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ডেকে আনছে। এই অর্থনৈতিক সংকটের ধাক্কা এড়াতে ট্রাম্প নিজেকে বিজয় ঘোষণা করে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। তবে এটা হলে ইরানের শক্তি কাঠামো দুর্বল হবে না, বরং তারা আরও সুসংগঠিত হবে। সামরিক ও পারমাণবিক ক্ষমতা পুনর্গঠন কার্যক্রম অক্ষত থাকবে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকির মধ্যে থাকবে। এই পরিস্থিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের আরও গভীরে টেনে আনতে পারে। হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলা করার পর উপসাগরীয় অংশীদাররা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য হতে পারে। নতুন বাস্তবতায় এই অঞ্চলে ব্যবসা করার খরচ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জাহাজীকরণ বীমার মূলধন বাড়তে পারে।
ইরানে সরকার উৎখাতের দাবি থেকে সরে আসা
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কোণঠাসা করার নীতি অবলম্বন করে যুদ্ধ বন্ধ করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরানে সরকার উৎখাতের দাবি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরে আসতে হবে। দেশটিকে সামরিক ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব বলয়ে আটকে ফেলতে হবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক হুমকি কমাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য ইরানের ভেতরে ভাঙন ধরানোর নীতি গ্রহণ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। যাতে সরকারের পতনের ডাকে আবারও হাজার হাজার মানুষ তেহরানের রাস্তায় নেমে আসে।