August 17, 2026, 3:23 pm
Title :
শিগগির জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে: জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ছয় মাসে জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে সরকার: মাহদী আমিন রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এসেছে: প্রেস সচিব সরকারের ১৮০ দিন নিয়ে ই-বুক ব্যবসায়ী হত্যা মামলায় সাবেক এমপি মিলনকে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ মাছ উৎপাদনে মান নিশ্চিত করে রপ্তানি বাড়াতে হবে: আমিন উর রশিদ সরকার কাজ করছে, দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত বিনিয়োগ-ব্যাংকিং-জ্বালানি সংকট, তারেক রহমানের সরকারের অর্জন কতটা? শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু-ফারজানাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া ই-রিকশা চার্জে জরিমানা, নিবন্ধন-নবায়ন হবে না

‘মেসি কি সর্বকালের সেরা?’ প্রশ্নটা কি আর তোলা উচিত?

Reporter Name
  • Update Time : Thursday, July 16, 2026
  • 33 Time View

তিনি প্রথমবার যখন বিশ্বকাপে পা রাখছেন, সেবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা গিয়েছিল মোটামুটি ছয়জন ‘নতুন ম্যারাডোনা’ নিয়ে— রিকেলমে, তেভেজ, স্যাভিওলা, আইমার, ক্রেসপো এবং একটা পিচ্চি- নাম তার লিওনেল মেসি। খোদ দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা কাজটা সহজ করে দিলেন। বললেন, ‘এই যে মেসিকে দেখছো, সেই আমার যোগ্য উত্তরসূরি।’

খোদ ম্যারাডোনা যখন সত্যায়ন করবেন কারও, তাকে নিয়ে আর যাই হোক সন্দেহ থাকা চলে না। ৩ ম্যাচে ৪০ মিনিট খেলে ১টি করে গোল করে আর করিয়ে আভাসটা দিয়ে রেখেছিলেন ১৯ বছর বয়সী ছোট্ট সেই ছেলেটি। সেই তাকে কিনা, কোয়ার্টার ফাইনালে নামালেন না কোচ হোসে পেকারমান! নামালে আর্জেন্টিনা জার্মানির কাছে ওভাবে হারত কিনা, কে জানে? সে প্রশ্নের জবাব মেলা সম্ভব নয় আর, যা গেছে, তা তো গেছেই, নাকি?

সেই টুর্নামেন্টের পর রিও দে লা প্লাতায় বহু জল গড়িয়েছে। ম্যারাডোনা পরের বার নিজে কোচ হয়েও মেসির সেরা টুর্নামেন্টটা এনে দিতে পারেননি। এরপর তো তার আদরের মেসি ধীরে ধীরে তার চক্ষুশূলই হলেন। যে ম্যারাডোনা তাকে নিজের উত্তরসূরি বানিয়েছিলেন, সেই ম্যারাডোনাই বললেন, ‘আরে ও কীসের নেতা, যে বড় ম্যাচ এলে ভয়ে কাঁপতে থাকে, সে কীভাবে নেতা হয়?’

তার মুখ থেকে যখন এই অমিয় বচন আসছে, তখনই মেসি সর্বকালের সেরাদের একজন। বয়স তখন তার মোটে ২৯। কেন? ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৫ বারের ব্যালন ডি’অর যে ছিল আর একজনের! জাতীয় দলের জার্সিতেও কি কম কিছু পেয়েছিলেন? খুব কাছে গিয়েও ২০১৪ বিশ্বকাপ জেতা হয়নি, ২০১৫ আর ২০১৬ কোপাও নয়; তবু সে তিনটি টুর্নামেন্টের দুটোতে জিতেছিলেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ওই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে টানা তিন ফাইনালে খেলাও তো কম কৃতিত্বের নয়!

তবু সর্বকালের একমাত্র সেরা খেলোয়াড় তিনি কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো লড়ছিলেন পাল্লা দিয়ে। তাকে এগিয়ে দিয়েছিল ২০১৬ ইউরোর শিরোপা, দেশের হয়ে এমন একটা শিরোপার জন্য সবকটা ব্যালন ডি’অর বিসর্জন দিয়ে দিতে পারেন, এমন কথা মেসিই বলেছিলেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী যখন পরম আরাধ্য সে শিরোপা পেয়ে যাবেন, তখন দৌড়ে মেসি পিছিয়ে পড়বেন, সেটাই সত্য।

২০১৮ বিশ্বকাপেও সে আশা পূরণ হলো না। সেবারের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের টুঁটি চেপে ধরেও যখন দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নিতে হলো, তখন তো মেসির কবর খোঁড়াই হয়ে গিয়েছিল রীতিমতো! লাতিন খেলোয়াড়রা তিরিশের পর বুড়িয়ে যান, মেসি ৩৫ বছর বয়সে গিয়ে আর কীইবা করতে পারবেন? সে কারণে ২০১৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর সেই ম্যাচের ধারাভাষ্যকার বলেই ফেলেছিলেন- ‘এটা নিশ্চিতভাবে বিশ্বকাপে মেসির শেষ ম্যাচ। পরের বার যখন বিশ্বকাপ শুরু হবে, তখন তার বয়স হবে ৩৫; তা আর কী করে হয়?’

ক্লাবে মেসি সফল ছিলেন। সে ক্লাব পারফর্ম্যান্সও ছিল পড়তির দিকে। ২০১৫ সালের পর বার্সাকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতাতে পারেননি দারুণ পারফর্ম করেও। তাই প্রশ্নটা আরও জোরালো হচ্ছিল।

সেই মেসি গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন ২০২১ এর দিকে। তার কুশীলব লিওনেল স্কালোনি, সেই স্কালোনি যাকে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আরে ওর তো ট্রাফিক সামলানোরও যোগ্যতা নেই, ও কী করে দল সামলাবে!’ সেই তিনি এমন এক কাজ করলেন, যা ম্যারাডোনা তো নয়ই, বোধ করি আলেসান্দো সাবেয়াও পারেননি। তিনি মেসিকে মধ্যমণি করে দল সাজালেন। বাকি কাজটা করলেন মেসি নিজে। দলের সবাইকে এমনভাবে আগলে রাখলেন যে, তিনি বললে সবাই যুদ্ধে নেমে পড়ে রীতিমতো।

আর্জেন্টিনার সুদিন ফিরল তাতেই। ২৮ বছর পর কোপা আমেরিকা জিতল দলটা। সেটাই সব গেরো খুলে দিল। মেসি এরপর ফিনালিসিমা জেতালেন ইউরোজয়ী ইতালিকে হারিয়ে, বনলেন সেরা খেলোয়াড়।

তারপর এল ২০২২ বিশ্বকাপ। সেবার আর্জেন্টিনা শুরুর ম্যাচ হেরে বসেছিল সৌদি আরবের কাছে। সে হারের পর মেসিই এলেন সংবাদ মাধ্যমে, সমর্থকদের বললেন, ‘আশা হারাবেন না আমাদের ওপর। এই দল আপনাকে হতাশার সাগরে ডুবিয়ে পালাবে না।’ নানা নাটক, মহা-নাটকের পর আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠল। সেবারের সেরা দল ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা জিতল বিশ্বকাপ, ম্যারাডোনা আর মেক্সিকোর মহাকাব্যের ৩৬ বছর পর আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো আর্জেন্টিনা। ৭ গোল করে, ৩ গোল করিয়ে মেসি বনে গেলেন সেরার পুরস্কার। সর্বকালের সেরার আলাপটা তাতেই তো শেষ হয়ে গিয়েছিল তাই না? বিদগ্ধ ফুটবল ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরি তো সাফ সাফ বলেই দিয়েছিলেন সে কথা!

সে বিশ্বকাপ জিতে মেসি ইউরোপ থেকেই বিদায় নিলেন। পাড়ি জমালেন মেজর লিগ সকারে। সেখানেও নিজের মুন্সিয়ানা দেখালেন, কখনো শিরোপা না জেতা, পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে ধুঁকতে থাকা ইন্টার মিয়ামিকে জেতালেন একাধিক শিরোপা, করলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেরাও।

সেই মেসি যখন এবারের বিশ্বকাপে পা রাখছেন, তখন কেউ কেউ হয়তো সন্দেহ করছিলেন, একটু করে টিপ্পনীও কাটতে ভুল করেননি কেউ কেউ, ‘এঁহ, রিটায়ারমেন্ট হোম এমএলএসের একজন কি আর বিশ্বকাপে ভালো করবেন?’ সে প্রশ্নের জবাবটা দেওয়া বাকি ছিল মেসির।

আলজেরিয়া ম্যাচে হ্যাটট্রিকটা করে সে জবাবটা দিলেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২ গোল করে বাকি ফিসফাসও খতম। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটা নিজের করে নিলেন পথিমধ্যে। জর্ডানের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে আরও এক গোলের পর সবাই অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করল, আরে এই ৩৯ বছর বয়সী ‘বুড়ো’ তো কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ডদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে!

এরপর নকআউটে শুরু হলো আরেক খেলা। দল ধুঁকছে, এমন অসময়ে গোল করে দিচ্ছেন, নাহয় করাচ্ছেন… তার কিছু একটা হচ্ছেই। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ডেডলক ভেঙে দিয়েছিলেন। মিশরের বিপক্ষে দল যখন ২-০ গোলে পিছিয়ে তখন গোল করে করিয়ে দলকে ফেরান সমতায়। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গোল পাননি, গোল করিয়ে দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। এবার ভেঙে দিলেন বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ডও।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও দল বিদায় থেকে ১০ মিনিটের দূরত্বে ছিল। ঠিক তখন মেসি জোড়া গোল করালেন সতীর্থ এনজো ফার্নান্দেজ আর লাউতারো মার্তিনেজকে দিয়ে। অবাক বিস্ময়ে আপনি দেখলেন, একজন ৩৯ বছর বয়সী খেলোয়াড় গোল প্রায় একাই টেনে দলকে নিয়ে গেলেন ফাইনালে!

মেসি ইতিহাসের সেরা ফুটবলার কি না, সে প্রশ্ন বহু দিনের। তাতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তাকে সেই ২০২১ সালেই ছুঁয়ে ফেলেছিলেন, ব্যালন ডি’অরে পেছনে ফেলেছিলেন তারও বহু আগেই।

তারপর তার সামনে ছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। সেই কিংবদন্তির ১৯৮৬ আসরের সমান ১০টি করে গোল করে-করিয়ে ২০২২ বিশ্বকাপে দলকে যখন শিরোপা জেতালেন, তখন তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন বোধ করি। কারণ ম্যারাডোনার ২ বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলে একটির শিরোপা জেতার কীর্তি তো মেসির ছোঁয়া হয়েই গিয়েছিল, তাকে এগিয়ে দিয়েছিল আগের বছর জেতা কোপা আমেরিকার শিরোপাটি।

এবারের আসর যখন শুরু হলো, বহু প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ছিল, তিনি তা দিয়েছেন। বহু রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার ছিল, তিনি তাও ভেঙেছেন।

তার সামনে ছিলেন পেলে, তিন বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি আর ছোঁয়া সম্ভব নয়, তবে একটা জায়গায় তাকে তো বটেই, সব্বাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। অধিনায়ক হিসেবে দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন তিন বার, যে কীর্তি আর নেই কারও। আগের দুবার বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেছেন, যেভাবে তার রথ ছুটেছে, ৮ গোল আর ৪ অ্যাসিস্ট করা মেসির এবারও সে পুরস্কারটা বগলদাবা করারই কথা। এমন সব তথ্য জানান দিচ্ছে, আর্জেন্টিনা এই তিন আসরে হাওয়ায় ভেসেছে তার ডানাতে ভর করেই।

পেলে-ম্যারাডোনা-রোনালদোরা সর্বকালের সেরাদের একজন হয়ে ছিলেন। কিন্তু এভাবে একটার পর একটা বিশ্বকাপে পারফর্ম করে, আসরের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটি হয়ে দলকে ফাইনালে তুলছেন, একটার পর একটা টুর্নামেন্টে সেরা বনে যাচ্ছেন… এমন কি কেউ দেখেছে আর?

বিশ্বকাপের বয়স ৯৬ হয়ে গেল এই গেল মাসে। প্রায় শতবর্ষ ছুঁইছুঁই এই আসরে কখনো না দেখা সে কীর্তিটি মেসি করে দেখালেন, শেষ বার যখন দেখাচ্ছেন, তখন তার বয়স ৩৯ বছর, যে বয়সে ফুটবলাররা ফুটবল ছেড়েছুড়ে কেউ বৈরাগ্য ধারণ করেন, কেউ বা আবার সংশ্লিষ্ট কিছুতে যোগ দেন সেই বয়সে!

‘মেসিই কি ফুটবলের সর্বকালের সেরা?’ বাক্যটা থেকে কি আর প্রশ্নবোধক চিহ্নটা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য কি এটাই যথেষ্ট কিছু নয়?

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © ajkerdorpon.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com