নিউজ ডেস্ক:
অন্তর্বর্তী সরকার মবকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি প্রশ্ন রেখেছেন তিনি। বলেছেন, ‘দেশে যেই ধরনের অত্যাচার-অনাচার ও ভয়ঙ্কর মব ভায়োলেন্স আমরা দেখেছি—সেগুলোর দায় তিনি নেবেন না কেন।’ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ‘চ্যানেল আই আজকের সংবাদপত্র’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
আব্দুন নূর তুষার বলেন, ‘তারা মানুষকে অত্যাচার করার জন্য মব পাঠিয়ে বা উৎসাহ দিয়ে তাদের বিরোধী মত গলা চেপে ধরেছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাদের তফাৎ কী, তখন ছাত্রলীগ যেত এখন মব যায়। ছাত্রলীগও কিন্তু এভাবে যায়নি, যেভাবে রাস্তাঘাটে মানুষের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। সুবিচার রহিত হয়েছিল।’
এই গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ধরা পড়েছেন। তিনি জীবিত। তাকে ভাত খাওয়ানোর পর পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস এটার কোনো ব্যবস্থা নেননি। পুলিশকে একবারও নির্দেশ দেননি যে, এদেরকে ধর, যারা এই কাজটা করেছে। এটা কি অন্যায় না, এটা কি খুন না? হত্যা করার অধিকার কি কাউকে দেয়া হয়েছে? উল্টো ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ দেয় যে, এত তারিখ থেকে এত তারিখের মধ্যে সকল অপরাধ মাফ। সকল অপরাধ কী করে মাফ হয়? এই অপরাধ কি মাফের যোগ্য?।’
নতুন সরকারের যাত্রাপথ কেমন দেখছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নতুন সরকারের যাত্রাপথ বিপদসংকুল—সেটা অনেকগুলো কারণে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে—তারা নির্বাচনে যাদেরকে পরাজিত করেছে, তাদের একটা গুপ্ত রাজনীতি আছে। সেই রাজনীতিকে তারা কীভাবে প্রতিহত করবে, গুপ্ত না থেকে সবার সামনে নিয়ে আসতে বাধ্য করবে—এটা খুবই জরুরি। একইসঙ্গে একটি দল বাইরে ও ভেতরে অর্থাৎ ওপরে এবং নিচে গুপ্ত ও উপ্ত—এই অবস্থায় থাকতে পারে না। সুতরাং এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই সরকারকে সারাক্ষণই চেষ্টা করতে হবে অবিশ্বাসকে প্রতিহত করার জন্য। কারণ গুপ্ত রাজনীতিকে তো বিশ্বাস করা কঠিন।’
তুষার বলেন, ‘দ্বিতীয়ত তাদের (বিএনপি) বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেটা হলো—তাদের মূল প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ। যে দলটির একটি বৃহৎ অংশ আছে, যারা ভোটার। যাদের অনেকেই এবার বিএনপিকে ভোটও দিয়েছে। তাদেরকে আস্থায় রাখা এবং আন্দোলন সংগ্রাম থেকে বিরত রাখা। এটা কিন্তু করতে হবে। এটা করতে গেলে তো জোর খাটিয়ে হবে না। এটা করতে হবে কর্মসূচির মাধ্যমে এবং কাজের মাধ্যমে। যখন তারা দেখবে—একটি সরকার ভালোভাবে দেশ পরিচালনা করছে, নাগরিকরা অধিকার পাচ্ছে, কাউকে ডিসক্রিমিনেট করা হচ্ছে না। তখন ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে থেকে শত্রুতাভাবাপন্নটা অনেকটা কমে যাবে। যেমন এখনই অনেক কমেছে। তারা জামায়াতের চাইতে বিএনপিকে বেশি বন্ধু মনে করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তৃতীয় যে চ্যালেঞ্জ সেটি হচ্ছে—ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রেখে যাওয়া আবর্জনা পরিষ্কার করা। ইউনূস সাহেব এসেছিলেন শেখ হাসিনার আবর্জনা পরিষ্কার করতে। কিন্তু তিনি সেই আবর্জনা তো পরিষ্কার করেনই নাই, উল্টো নতুন নতুন আবর্জনার ডাফটিং গ্রাউন্ড খুলেছেন। সেইগুলো তাদের (নতুন সরকার) ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। বহু চুক্তি, আদেশ, অধ্যাদেশ এবং বহু কীর্তিকলাপ তারা করে গিয়েছেন। যেগুলোকে তাদের (বর্তমান সরকার) এখন বোঝাতে হবে যে, কোনটা দেশের পক্ষে কোনটা বিপক্ষে, কোনটা ঠিক ছিল, কোনটা ঠিক ছিল না, কোনটা করা যাবে, কোনটা করা যাবে না। তখনই কিছু লোক বের হয়ে বলতে শুরু করবেন, উনি (ড. মুহাম্মদ ইউনূস) তো বলেছিলেন। তাহলে আপনি করছেন না বা আপনারা করছেন না। আর এটা বোঝানোর জন্য তাদেরকে (বর্তমান সরকার) একটা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।’
আগামী দিনে নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ আছে, স্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ আছে। বেকারত্বের চ্যালেঞ্জ আছে। নিরাপত্তার ঝুঁকি আছে। অনেক কিছু। মানে আমার কাছে মনে হয় যে, যারা ওই যে বিল্ডিং ব্লক দিয়ে খেলে। লেগো দিয়ে খুব সুন্দর একটা বাড়ি তৈরি করা যায়। কিন্তু ভেঙে ফেললে ওটাকে আরেকবার তৈরি করার জন্য দেখা যায় , আবারও সেই ১০/১২ ঘণ্টা, ১৫ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হয়। ওইরকম একটা অবস্থায় বাংলাদেশকে নিয়ে এসেছে। বিল্ডিং ব্লক দিয়ে হয়তো কেউ সাজাচ্ছিল। বিভিন্ন জায়গায় ভুল করছিল। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার যেভাবে লণ্ডভণ্ড করেছেন অনেক কিছু। পণ্ড করেছে এবং এক পর্যায়ে রাজনীতিতে অন্ড আমদানি করেছিল, মানে আন্ডা।’
‘এই অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। একইসঙ্গে যেসব জায়গাতে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয়েছে, সেটার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। এটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ’—উল্লেখ করেন আব্দুন নূর তুষার।
গণমাধ্যমের অফিসে আগুন দেয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘উনি (ড. মুহাম্মদ ইউনূস) প্রথম আলো জ্বালাতে দিয়েছেন, ডেইলি স্টার জ্বালাতে দিয়েছেন। উনি উদীচী ও ছায়ানটকে জ্বালাতে দিয়েছেন। উনি নির্দেশ দিলে এটা আটকাতো না? উনি কি নির্দেশ দিয়েছিলেন? আমরা তো অনেক ফোন রেকর্ড শুনি কে বা কারা গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন। এটা দিয়েছিলেন, সেটা দিয়েছিলেন, আমরা শুনি না? এটকা জাদুঘর তৈরি হয়েছে না, ওখানে গিয়ে ওনারা ফোনে শুনছেন কী কী আদেশ। ওনার আদেশটা শুনতে চাই যে, উনি এগুলো থামাতে চেয়েছিলেন। এই যে পত্রিকাতে আগুন দেয়া হয়েছে, সেটা থামাতে বলেছিলেন।’
‘সে সময় ওই জায়গায় চলে যাওয়ার কথা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একাধিক উপদেষ্টার। যে উপদেষ্টারা প্রথম আলোতে কলাম লেখেন। সেই উপদেষ্টারা প্রথম আলোকে জ্বলতে দেখেছেন। কিন্তু সেখানে যাননি। অথচ নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর গিয়েছিলেন’—তুষার।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাজার পোড়ানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এত বাউলকে অত্যাচার করা হলো। মাজার পোড়ানো হলো। উনি বলেছেন—ধর্মপ্রাণ মানুষ যারা, তারা অনেকেই মাজারভক্ত না। এই মাজারগুলো যে, ধ্বংস হয়েছে উনার শাসন আমলে—উনি সেটার দায়িত্ব নেবেন না? দেশে যেই ধরনের অত্যাচার-অনাচার, যেই ধরনের মব ও ভয়ঙ্কর ভায়োলেন্স আমরা দেখেছি—সেগুলোর দায়-দায়িত্ব তার নেই? অন্যের দায় স্বীকার করানোর জন্য উনি অস্থির, নিজের দায় কেন নেবেন না। সরকার হিসেবে উনি ব্যর্থ। সরকার প্রধান হিসেবে ব্যর্থ। সংবিধানকে আপহোল্ড করতে উনি ব্যর্থ। এমনকি উনি নিজের কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট আছে—এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে উনার যে নৈতিক অবস্থান, সেই অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। নিজের কর উনি মাফ করেছেন’, কীভাবে করেন?’