২০২৫ সাল জুড়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে তরুণ প্রজন্মের (জেনারেশন জেড বা জেন-জি) নেতৃত্বে একের পর এক গণআন্দোলন বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। কাঠমান্ডু থেকে লিমা-ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও তরুণদের চাওয়া-দাবি এক জায়গায় এসে মিলেছিল: বৈষম্য, দুর্নীতি, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং ক্ষমতাসীন এলিটদের প্রতি গভীর ক্ষোভ।
১৯৯০-এর শেষ ভাগ থেকে ২০১০-এর শুরুর দিকে জন্ম নেয়া এই প্রজন্ম ২০২৫ সালে রাজপথে নেমে আসে। হাতে আঁকা প্ল্যাকার্ড, টিকটক ও ডিসকর্ডে জন্ম নেয়া স্লোগান আর সহজ দাবিই হয়ে ওঠে আন্দোলনের ভাষা। সমাজবিজ্ঞানী মিশেল উইভিওর্কার মতে, এটি কেবল নিজেদের জন্য নয়-শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের দাবিতে একটি সর্বজনীন আন্দোলন। খবর ফ্রান্স ২৪
এই ঢেউয়ের সূচনা হয় ইন্দোনেশিয়ায়, যেখানে আইনপ্রণেতাদের অস্বাভাবিক উচ্চ ভাতা ঘোষণার প্রতিবাদে ছাত্ররা রাজপথে নামে। আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে জনপ্রিয় মাঙ্গা ওয়ান পিস-এর জলদস্যু পতাকা। সেপ্টেম্বর মাসে নেপালে আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নেয়-সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘নেপো-কিড’দের বিলাসী জীবন ফাঁস, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বন্ধ এবং শেষে পার্লামেন্টে আগুন। এতে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
আফ্রিকায় মাদাগাস্কারে তরুণরা বিদ্যুৎ ও পানির সংকটের পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ দাবি করে। মরক্কোয় ‘জেন জি ২১২’ নামে তরুণরা ডিসকর্ডে সংগঠিত হয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের দাবি তোলে।
লাতিন আমেরিকায় পেরুতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে তরুণরা। রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-পীড়নে ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, মরক্কো ও মাদাগাস্কারে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। তবে তাদের অর্জনও ছিল ঐতিহাসিক। নেপালে আন্দোলনের মুখে সরকার পতন হয় এবং ডিসকর্ডে ভোটের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ একটি নজিরবিহীন ঘটনা। বিপরীতে মাদাগাস্কারে সামরিক অভ্যুত্থান আন্দোলনের ফল ছিনিয়ে নেয়।
২০২৪ সালে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে জেন-জি-আন্দোলন বেশ কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক আন্দোলন ও বিক্ষোভের রূপ নিয়েছিল। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালসহ সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দেশব্যাপী বড় একটি আন্দোলনে রূপ নেয়, যা সরকারের কড়া দমন ও সহিংসতায় আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে এবং দেশজুড়ে জনসংহতিতে পরিণত হয়। একই ধারা অনুসারে ২০২৪ সালে রাষ্ট্রীয় নীতি, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে আফ্রিকার কেনিয়া, নেপাল ও মাদাগাস্কার, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মরোক্কো ও পেরুর মতো বিভিন্ন দেশে যুব সমাজের অসন্তোষ বড় বিক্ষোভে রূপ নেয়-যেখানে তরুণরা অনলাইন আয়োজিত সমর্থন থেকে সরাসরি রাস্তায় নেমে সরকারের প্রতি আর্থ-সামাজিক দাবি উত্থাপন করেছিল।
২০২৬ সালকে সামনে রেখে প্রশ্ন রয়ে গেছে-এই আন্দোলন স্থায়ী হবে, নাকি ক্ষণস্থায়ী ঢেউ হয়ে মিলিয়ে যাবে? তবে এক বিষয়ে বিশ্লেষকরা একমত- ক্ষমতা দখলের চেষ্টা না করেও, সংগঠিত হয়ে নিজেদের দাবিকে কেন্দ্রীয় আলোচনায় আনতে জেনারেশন জেড ২০২৫ সালে বিশ্ব রাজনীতিতে এক গভীর ছাপ রেখে গেছে।