সকালে চুলায় আগুন জ্বলে না, বিকেলে গ্যাসের চাপ কমে রান্নাই ঠিকমত হয় না—রাজধানীর বহু পরিবার এখন বৈদ্যুতিক চুলা, এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা বাইরে থেকে খাবার নিয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে আয়ের ক্ষতি সইছে, আর শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে বা আংশিকভাবে বন্ধ হচ্ছে; বিদ্যুৎকেন্দ্রও সরবরাহ সংকটে পড়ছে। এসব সমস্যার সূত্রে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ)-র কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কমে যাওয়ার খবর এসেছে, যা দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রভাব অনিবার্য ছিল।
কিন্তু সমস্যাটির জটিলতা কেবল একটি যান্ত্রিক ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ নয়—এটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। তিতাসের প্রদত্ত আঙ্কড়ায় বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট; অর্থাৎ এমন ঘাটতি আছে যা কেবল টার্মিনাল ঠিক করলেই উঠে যাবে না। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, কিন্তু সঙ্গে পর্যাপ্ত মজুদ, বিকল্প সরবরাহ ও অবকাঠামোগত বহুমুখীকরণ গড়ে তোলা হয়নি—ফলে আমদানির কোনো আঁচড়ই জাতীয় গ্রিডে তাৎপর্যপূর্ণ চাপ সৃষ্টি করে।
সমাধান একদিকে জরুরি মেরামত ও সরবরাহ পুনরুদ্ধার হলেও দূরদৃষ্টির পরিকল্পনা ছাড়া পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে না। স্থানীয় অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করে পর্যায়ক্রমিক কূপ খনন (উল্লেখ্য ১০০ কূপের পরিকল্পনা, বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে নতুন কূপ, পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার) এবং সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান বাড়ানো জরুরি; পাশাপাশি এলএনজি আমদানির উৎস, টার্মিনাল ও মজুদের বহুমুখীকরণ, স্থলভিত্তিক টার্মিনালের বিকাশ ও অন্তত ১৫ দিনের মজুত সক্ষমতা (যা ড. ইজাজ হোসেনও প্রস্তাব করেছেন) তৈরি করা প্রয়োজন। তদুপরি জ্বালানি বরাদ্দে স্বচ্ছ নীতি, ভোক্তা সুরক্ষা ব্যবস্থায় আর্থিক ধাক্কা মোকাবেলায় ব্যবস্থা ও শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা ও নবায়নযোগ্য উৎসের প্রসার—এই সবকে একত্রে রেখে একটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল হাতে নেয়া ছাড়া গ্যাসের একক সংকট সহজে রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেয়া বন্ধ করা যাবে না।