September 12, 2026, 12:19 pm

জর্দার কৌটায় ১০ বছরের সঞ্চয়, খুলতেই মনোয়ারার মাথায় হাত

Reporter Name
  • Update Time : Monday, September 7, 2026
  • 25 Time View

শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোড এলাকার বাসিন্দা মনোয়ারা বেগমের জীবনে নেমে এসেছে এক চরম দুর্দশা। দীর্ঘ এক দশক ধরে তিল তিল করে জমানো দুই লাখ টাকা হঠাৎ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার মাথায় হাত পড়েছে। তার স্বামী জিয়া উদ্দীন পেশায় একজন মিষ্টির কারিগর ছিলেন এবং মনোয়ারা নদী থেকে বালু-পাথর তুলে বিক্রি করতেন। তাদের এই যৌথ কষ্টের উপার্জনেই কোনোমতে চলত তাদের অভাবের সংসার। এই সীমিত আয় থেকেই তারা অনেক কষ্ট করে তাদের দুই মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেছিলেন। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং কোনো বিপদে পড়ার আশঙ্কায় তারা নিয়মিত কিছু অর্থ জমাতেন। এভাবে খুচরা টাকা জমিয়ে একসময় তারা বড় নোট সংগ্রহ করতেন এবং দীর্ঘ ১০ বছরের সাধনায় তাদের জমানো টাকার পরিমাণ প্রায় দুই লাখ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।

কয়েক মাস আগে মনোয়ারা বেগমের স্বামী জিয়া উদ্দীন মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার পাশাপাশি তার জীবনে অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়। এদিকে জীবিকার প্রধান উৎস যে ভোগাই নদী ছিল, সেখানেও আগের মতো বালু ও পাথর পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে সেখান থেকেও তার আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর শোকে ও অভাবে যখন তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তার শেষ সম্বলটুকুও চিরতরে হারিয়ে যায়। সংকটময় এই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো যখন অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, তখন তিনি জমানো টাকাগুলো ব্যবহারের কথা চিন্তা করেন। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় নিরাপদ মনে করে তারা একটি প্লাস্টিকের জর্দার কৌটার ভেতরে সেই দুই লাখ টাকা যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন।

সম্প্রতি নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ও সংসারের তাগিদে সেই জর্দার কৌটাটি বের করেন অসহায় মনোয়ারা বেগম। কিন্তু দীর্ঘদিনের বন্দি অবস্থায় কৌটার মুখটি শক্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি তা স্বাভাবিক উপায়ে খুলতে পারেননি। পরবর্তীতে বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে তিনি বাধ্য হয়ে কৌটাটির মুখ কেটে ভেতরে থাকা টাকাগুলো বের করেন। কিন্তু কৌটা কাটার পর তার চোখের সামনে যে দৃশ্য ভেসে ওঠে, তাতে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। ভেতরে থাকা কাগজের নোটগুলো পোকায় বা অন্য কোনো কারণে সম্পূর্ণ ঝাঁঝরা হয়ে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। ওই টাকাগুলো এখন আর কোনোভাবেই ব্যবহার করা সম্ভব নয় এবং বাজারেও এর কোনো বিনিময় মূল্য নেই। নিজের চোখের সামনে জীবনের শেষ সম্বল এভাবে ধূলিসাৎ হতে দেখে তিনি পাগলের মতো প্রলাপ বকতে শুরু করেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনোয়ারা বেগম জানান যে, এই জমানো টাকাই ছিল তার একমাত্র অবলম্বন ও ভবিষ্যতের ভরসা। তিনি বলেন, স্বামী নেই, শরীরে আগের মতো কাজ করার শক্তিও নেই, নদীর কাজও বন্ধ হয়ে গেছে, আর এই দিকে তিল তিল করে জমানো শেষ সম্বলটুকুও নষ্ট হয়ে গেল। এখন তিনি কার কাছে যাবেন এবং কীভাবে বেঁচে থাকবেন, তা তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছেন না। প্রতিবেশীরাও এই দরিদ্র নারীর এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সামাদ জানান যে, অনেক কষ্ট করে তিল তিল করে জমানো এই অর্থ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মনোয়ারা এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন এবং তার পাশে সরকারের দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মালেক জানিয়েছেন যে, অসহায় মনোয়ারা বেগমের এই করুণ পরিস্থিতির বিষয়টি তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এই নারীর পক্ষ থেকে সরকারি সহায়তার জন্য আবেদন করা হলে বিধি মোতাবেক তাকে দ্রুত সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে। প্রশাসনের এমন আশ্বাসে কিছুটা হলেও ভরসা খুঁজছেন নিঃস্ব এই নারী। স্থানীয় সচেতন মহলও মনে করছে, দ্রুত সরকারি বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সহযোগিতা পেলে এই নারী কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © ajkerdorpon.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com