আরও চার বছর বাকি ২০৩০ ফুটবল বিশ্বকাপের। এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে সম্ভাব্য ফেবারিটদের নিয়ে হিসাব-নিকাশ। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে একটি বড় প্রজন্মের বিদায় ঘটেছে। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লুকা মদরিচ, নেইমার, হামেস রদ্রিগেজ, গুইলার্মো ওচোয়ার মতো কিংবদন্তিদের অধ্যায় শেষ হওয়ায় এখন নজর নতুন প্রজন্মের দিকে। দ্য গার্ডিয়ান
এই প্রাথমিক পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সেই দলগুলোর ওপর, যাদের মূল শক্তি এখনো বিশের কোঠায় থাকা ফুটবলারদের ঘিরে। আগামী চার বছরে এসব খেলোয়াড় আরও পরিণত হয়ে উঠবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সেই বিবেচনায় ২০৩০ বিশ্বকাপে অন্তত কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে এমন ১০টি দলকে নিয়ে তৈরি হয়েছে এই তালিকা।
স্পেন: সবচেয়ে বড় ফেবারিট
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেদের মাটিতে ২০৩০ বিশ্বকাপ খেলবে স্পেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই শিরোপা ধরে রাখার দৌড়ে তারাই সবচেয়ে এগিয়ে। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে গত কয়েক বছরে দলটি যেভাবে নিজেদের গড়ে তুলেছে, তাতে আগামী চার বছরে আরও পরিণত স্পেনকেই দেখা যেতে পারে।
গোলপোস্টে উনাই সিমোন, রক্ষণে পাও কুবার্সি, এরিক গার্সিয়া ও পেদ্রো পোরো, মাঝমাঠে রদ্রি, পেদ্রি ও গাভির মতো তারকারা থাকবেন দলের ভিত্তি। আক্রমণে লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসকে ঘিরেই থাকবে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
এ ছাড়া ডিন হাউসেন, মার্ক বার্নাল, ফারমিন লোপেস, পাবলো বারিওস ও হাভিয়ের গেরার মতো তরুণদের উপস্থিতি স্পেনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। যদি সামু আগেহোওয়া বা গঞ্জালো গার্সিয়ার কেউ একজন নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তাহলে স্পেনের আক্রমণভাগ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।
ফ্রান্স: জিদানের হাতে নতুন অধ্যায়
দীর্ঘদিনের কোচ দিদিয়ের দেশমের যুগ শেষ হওয়ার পর ফ্রান্সের দায়িত্ব নেয়ার কথা জিনেদিন জিদানের। নতুন কোচের অধীনে দলটি কীভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করে, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।
কিলিয়ান এমবাপ্পে তখনও দলের সবচেয়ে বড় তারকা। তার সঙ্গে মাইকেল ওলিসে ও দেজিরে দুয়ের মতো গতিময় আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হতে পারে। মাঝমাঠে অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, মানু কোনোয়ে ও খেফরেন থুরামের সমন্বয় ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী মিডফিল্ড গড়ে তুলতে পারে।
রক্ষণে উইলিয়াম সালিবা, দায়ো উপামেকানো ও ইব্রাহিমা কোনাতে থাকায় ফ্রান্সের ভারসাম্যও শক্তিশালী থাকবে। তবে স্পেনের মতো সংগঠিত দলের বিপক্ষে সফল হওয়ার কৌশল বের করাই হবে জিদানের বড় পরীক্ষা।
ইংল্যান্ড: প্রতিভার অভাব নেই, প্রশ্ন স্ট্রাইকারে
২০২৬ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত দারুণ ফুটবল খেললেও শেষ পর্যন্ত শিরোপার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি ইংল্যান্ড। তবে আগামী বিশ্বকাপের জন্য তাদের ভিত্তি এখনো বেশ শক্ত।
মাঝমাঠে জুড বেলিংহ্যাম, ডেকলান রাইস, কোবি মাইনু ও এলিয়ট অ্যান্ডারসনের সমন্বয় ইংল্যান্ডের বড় শক্তি। উইংয়ে বুকায়ো সাকা ও অ্যান্থনি গর্ডন গতি যোগ করবেন।
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা স্ট্রাইকার পজিশনে। হ্যারি কেইনের বয়স তখন ৩৬ হবে। তিনি আগের মতো কার্যকর থাকবেন কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ তার যোগ্য উত্তরসূরি এখনো পুরোপুরি তৈরি করতে পারেনি ইংল্যান্ড। তবে কোল পামার, ফিল ফোডেন, লুইস হল, অ্যাডাম ওয়ার্টন ও রিও এনগুমোহার মতো তরুণরা দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ দিচ্ছেন।
মরক্কো: আফ্রিকার বড় আশা
২০৩০ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক মরক্কো গত কয়েক বছরে নিজেদের অন্যতম ধারাবাহিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। টানা দুই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা, একবার সেমিফাইনাল খেলা এবং আফকন জয়ের অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
আশরাফ হাকিমির নেতৃত্বে রক্ষণভাগ যেমন শক্তিশালী, তেমনি মাঝমাঠে আইয়ুব বুয়াদি ও আজেদ্দিন উনাহি ভারসাম্য আনবেন। আক্রমণে ব্রাহিম দিয়াস, বিলাল এল খান্নুস ও ইসমাইল সাইবারি প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হতে পারেন।
তরুণদের মধ্যেও রয়েছে বেশ কয়েকজন সম্ভাবনাময় ফুটবলার। আর যদি অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু আগের ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তাহলে মরক্কো আবারও বিশ্বকাপে চমক দেখাতে পারে।
আর্জেন্টিনা: মেসির পর নতুন বাস্তবতা
লিওনেল মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করা। তবে দলটি শুধু একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরশীল নয়, সেটিও গত কয়েক বছরে প্রমাণ করেছে।
হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজ আক্রমণের নেতৃত্ব দেবেন। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ থাকবেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। রক্ষণে নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ অভিজ্ঞতার জোরে দলকে নেতৃত্ব দেবেন।
এ ছাড়া অনূর্ধ্ব-২০ দলের মিলতন দেলগাদো, হুলিও সোলের ও সান্তিনো বারবির মতো তরুণরাও ভবিষ্যতের বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
পর্তুগাল, নরওয়ে, আইভরি কোস্ট, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র
পর্তুগালের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে দিয়োগো কোস্তা, নুনো মেন্দেস, জোয়াও নেভেস ও ভিতিনহাদের প্রজন্ম। তবে ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা ও রুবেন দিয়াসের বয়স বেড়ে যাওয়ায় দলটি কতটা ভারসাম্য ধরে রাখতে পারবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
নরওয়ের নেতৃত্বে থাকবেন আর্লিং হালান্ড। তার সঙ্গে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ, আন্তোনিও নুসা, অস্কার বব ও মার্টিন ওডেগার্ড থাকায় দলটি যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
আফ্রিকার আরেক শক্তিশালী প্রতিনিধি আইভরি কোস্টও সম্ভাবনাময় স্কোয়াড নিয়ে এগোচ্ছে। আমাদ দিয়ালো, সিমোঁ আদিংরা, এলিয়ে ওয়াহি ও ওসমান দিয়োমান্দেদের নিয়ে দলটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিয়মিত শক্তি হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছে।
জার্মানির দায়িত্বে ইয়ুর্গেন ক্লপের হাতে পুরো চার বছর সময় থাকায় দলটি নতুন করে নিজেদের গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, জামাল মুসিয়ালা, কাই হাভার্টজ ও লেনার্ট কার্লদের ঘিরে আবারও শিরোপার লড়াইয়ে ফিরতে চায় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আরও পরিণত দল হিসেবে ২০৩০ বিশ্বকাপে ফিরতে চায়। ফোলারিন বালোগুন, মালিক টিলম্যান, ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ, টাইলার অ্যাডামস ও জিও রেইনাদের ঘিরে তাদের নতুন স্বপ্ন।
নতুন প্রজন্মের বিশ্বকাপ
২০৩০ বিশ্বকাপকে অনেকেই নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন। মেসি-রোনালদোদের যুগ শেষ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলের নেতৃত্ব এখন ইয়ামাল, এমবাপ্পে, বেলিংহ্যাম, হালান্ড, পেদ্রি, গাভি কিংবা হুলিয়ান আলভারেজদের হাতে।
বর্তমান শক্তি, খেলোয়াড়দের বয়স, স্কোয়াডের গভীরতা এবং আগামী চার বছরের সম্ভাব্য উন্নতির হিসাব করলে স্পেনই আপাতত সবচেয়ে এগিয়ে। তবে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, মরক্কো, আর্জেন্টিনা কিংবা পর্তুগালের মতো দলগুলোও ব্যবধান কমিয়ে শিরোপার লড়াইয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে প্রস্তুত।