বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে ভাগ্য, কৌশল, দক্ষতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো প্রায়ই আলোচনার জন্ম দেয়। এবারের টুর্নামেন্টেও তেমনই একটি বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে বিস্তর আলোচনা। অনেক ফুটবল-সমর্থকের দাবি, নকআউট পর্বে স্পেনের মুখোমুখি হওয়া প্রায় প্রতিটি দলের গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্ডার কিংবা গোলরক্ষক ম্যাচের আগে বা ম্যাচ চলাকালীন চোটে পড়েছেন। ফলে স্পেনের জন্য প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভাঙার কাজ তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ নেই, তবু ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
রাউন্ড অব সিক্সটিনে স্পেনের প্রতিপক্ষ ছিল পর্তুগাল। সেই ম্যাচে পর্তুগালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেফট ব্যাক নুনো মেন্ডিস চোটের কারণে স্বাভাবিক ছন্দে থাকতে পারেননি। উল্লেখযোগ্য কোনো বড় সংঘর্ষ ছাড়াই তার মাঠ ছাড়তে হওয়া অনেকের নজর কাড়ে।
কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। পুরো ম্যাচজুড়ে তিনি দুর্দান্ত সব সেভ করে স্পেনের আক্রমণ ঠেকিয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু ম্যাচের শেষদিকে হঠাৎ চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্পেন দ্বিতীয় গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তভাবে নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। এই ঘটনাকেও অনেকে স্পেনের পক্ষে বড় মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন।
সেমিফাইনালে একই ধরনের আলোচনা তৈরি হয় ফ্রান্সকে ঘিরে। দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সেন্টারব্যাক উইলিয়াম সালিবা চোটে পড়ায় রক্ষণভাগের ভারসাম্য নষ্ট হয় বলে অনেকের মত। ম্যাচ চলাকালীন তাঁর মাঠ ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে ফাইনালকে ঘিরে। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের দুই ভরসার নাম লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো দুজনই ম্যাচ চলাকালীন চোটে আক্রান্ত হন। বিশেষ করে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের ঘটনা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে বিস্ময় দেখা যায়। অতীতে গুরুতর আঘাত নিয়েও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরিচিত এই ডিফেন্ডারকে বড় ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই প্রথমার্ধে মাঠ ছাড়তে হয়। অনেক দর্শকের চোখে তার প্রতিক্রিয়াও ছিল অস্বাভাবিকভাবে শান্ত, যা নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়।
তবে এসব ঘটনার মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। ফুটবলে ইনজুরি খুবই স্বাভাবিক এবং উচ্চগতির নকআউট ম্যাচে পেশির চোট, ক্লান্তিজনিত সমস্যা কিংবা পূর্বের আঘাত ফিরে আসার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য বা সংশ্লিষ্ট দলের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছাড়া কোনো ইনজুরিকে রহস্যজনক বা পরিকল্পিত বলে দাবি করার সুযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনের পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের সংগঠিত ডিফেন্স, শক্তিশালী মিডফিল্ড এবং বলের নিয়ন্ত্রণ। তবে একই সঙ্গে তাদের দুর্বলতার জায়গা ছিল ফিনিশিং। অনেক ম্যাচেই অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে বেগ পেতে হয়েছে স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডদের। ফলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ দুর্বল হয়ে পড়লে স্পেনের জন্য সুযোগ কাজে লাগানো কিছুটা সহজ হয়ে থাকতে পারে এমন বিশ্লেষণও উঠে এসেছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায় এটি কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিরল এক ধারাবাহিক ঘটনা? এর নির্দিষ্ট উত্তর এখনো কারও কাছে নেই। ফুটবলের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যা বছরের পর বছর বিতর্কের বিষয় হয়ে থেকেছে। স্পেনের নকআউট পর্বে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষকদের একের পর এক চোটে পড়ার ঘটনাও হয়তো তেমনই একটি আলোচিত অধ্যায় হয়ে থাকবে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি। তাই এটিকে আপাতত একটি আলোচিত কাকতালীয় ঘটনা হিসেবেই দেখা অধিক যুক্তিসংগত।