পরিবহন মালিক জয়নাল আবেদীন বলেন, বর্তমানে যানজটের কারণে একটি গাড়িকে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় লাগে। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, চালকের সময় নষ্ট হয় এবং পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়। মহাসড়ক প্রশস্ত হলে যান চলাচল স্বাভাবিক হবে। এতে সময় ও খরচ দুটিই কমবে। মহাসড়কের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও মোড়গুলোতে সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মহাসড়কের সুফল আরো বেশি পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন কৃষিপণ্য, মাছ, লবণ, শিল্পপণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য চট্টগ্রাম নগরী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পরিবহন করা হয়। কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় সড়কটির ওপর পর্যটন যাত্রীদের চাপও ব্যাপক। মহাসড়ক প্রশস্ত ও নিরাপদ হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি পর্যটকদের ভোগান্তিও কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে মানুষের চলাচল বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে হোটেল মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং পর্যটননির্ভর বিভিন্ন খাতে। একই সঙ্গে কৃষক ও উৎপাদকরা দ্রুত তাদের পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ পাবেন।
মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও চলছে মাটি কাটা ও ভরাটের কাজ, কোথাও পুরোনো সড়কের পাশে নতুন অংশ তৈরির প্রস্তুতি। ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে চলছে মাটি সরানো, সমতল করা ও সড়কের ভিত্তি প্রস্তুতের কাজ। একই সঙ্গে শ্রমিকরা বিভিন্ন অংশে অবকাঠামোগত কাজ করছেন। নির্মাণকাজ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কের দুই পাশে দৃশ্যমান হচ্ছে নতুন প্রশস্ত সড়কের অবয়ব। ফলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসানের আশায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা।
স্থানীয়রা জানান, মহাসড়ক প্রশস্ত করলেই কাজ শেষ হবে না। প্রশস্ত সড়কের সুফল পেতে হলে এর সঙ্গে সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের দাবি, সড়কের পাশে অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত বাসস্টপ, নিরাপদ পথচারী পারাপার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় সাইন-সিগন্যাল, সড়কবাতি এবং বাজারকেন্দ্রিক যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পটিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা গাজী আমির হোসেন বলেন, রাস্তা প্রশস্ত হচ্ছে এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। কিন্তু রাস্তার দুই পাশে আবার যদি অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে ওঠে, তাহলে কয়েক বছর পর একই সমস্যা তৈরি হবে। তাই এখন থেকেই এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। বিশেষ করে রাতের বেলায় চুরি ছিনতাই প্রতিরোধে মহাসড়কে লাইটিং ব্যবস্থার জোর দাবি জানান।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, বর্তমানে বর্ষা মৌসুম হওয়ায় নির্মাণাধীন অংশে পানি জমে যান চলাচলে যাতে বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার দাবি জানিয়েছেন। নির্মাণকাজ চলাকালে বিকল্প ও নিরাপদ যান চলাচলের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড এবং রাতে দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারমুখী যান চলাচলে সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে যানজট নিরসন, যাতায়াতের সময় কমানো এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় গতি আনার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সড়ক মহাসড়ক সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সড়কের প্রস্থ বাড়ানো নয়, মহাসড়ক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি। সড়কের পাশে অবৈধ দখল রোধ, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো এবং কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটির সুফল বহুগুণ বাড়বে।
২১ দশমিক ৭ কিলোমিটার মহাসড়ক প্রশস্তকরণের এ কর্মযজ্ঞ দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। এপ্রিল ২০২৭ সালের মধ্যে কাজ শেষ হলে সড়কটির ধারণক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি যানজট ও যাতায়াতের সময় কমবে এমন প্রত্যাশা এখন পটিয়া থেকে কক্সবাজারমুখী লাখো মানুষের। তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা, নির্মাণের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং নির্মাণকালীন জনভোগান্তি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। এসব নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক শুধু একটি প্রশস্ত সড়ক নয়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতি, পর্যটন ও যোগাযোগের নতুন গতির প্রধান করিডোর হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ পুরোনো সংকীর্ণ মহাসড়কের জায়গায় ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের নতুন ‘ইকোনমিক ও ট্রান্সপোর্ট করিডর যার সুফল পেতে অপেক্ষায় লাখো মানুষ।